গাজীপুরের শ্রীপুরে এক পোশাকশ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় আয়োজিত মিলাদ মাহফিলকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়েছে। আজ শনিবার সকালে উপজেলার টেপিরবাড়ি গ্রামের কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড কারখানার সামনে হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। এ সময় শ্রমিকদের ওপর পুলিশ লাঠিপেটা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শিল্প পুলিশ তিন দফা সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের কথা জানিয়েছে।
শ্রমিকদের ভাষ্য, গত বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেড কারখানার ভেতরে আজ মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এতে ব্লু প্ল্যানেট গ্রুপের মালিকানাধীন বদর স্পিনিং মিলস ও কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেডের শ্রমিকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সকাল ৯টার দিকে মিলাদ শুরুর আগে বদর স্পিনিং মিলসের শ্রমিকেরা সেখানে জড়ো হলে কারখানার সামনে উত্তেজনা দেখা দেয়।
কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেডের শ্রমিক রায়হান মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, মিলাদ অনুষ্ঠানে আসছিলেন পাশে বদর স্পিনিং মিলসের শ্রমিকেরা। এ সময় হঠাৎ লাঠিসোঁটা নিয়ে বহিরাগত কয়েকজন দল বেঁধে শ্রমিকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে কারখানায় প্রবেশ করতে চান। পুলিশ তাঁদের বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। তাঁদের সেখান থেকে জোর করে সরিয়ে দেয় পুলিশ। এ সময় কয়েকজন শ্রমিক আহত হন।
মো. রনি নামের এক শ্রমিক বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে অপরিচিত লোকজন কারখানার সামনে এসে উপস্থিত হন। তাঁরা শ্রমিক না হয়েও সেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলেন। রনি আরও বলেন, ‘আমরা চাই শান্তিপূর্ণ সমাধান। এমন হট্টগোল আমাদের কাম্য নয়। গতকাল ও আজ যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা শ্রমিকেরা করেননি।’
বদর স্পিনিং মিলসের শ্রমিক চম্পা আক্তার বলেন, তাঁরা উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি চান না। সকালে শ্রমিকেরা শান্তিপূর্ণভাবে কারখানায় আসার সময় শ্রমিকদের সঙ্গে বহিরাগত লোকজন যোগ দেন। তাঁরা এই শান্ত পরিবেশকে অহেতুক অশান্ত করেন। চম্পা দাবি করেন, গত বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরের কারখানাগুলোয় যে ভাঙচুর হয়েছে, সেটিও সন্দেহজনক। তাঁর দাবি, ওই ভাঙচুর শ্রমিকেরা করেননি।
মো. আশিকুর রহমান নামের এক শ্রমিক বলেন, পুলিশের লাঠিপেটায় বদর স্পিনিং মিলসের কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আল আমিন নামের এক শ্রমিককে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
সকাল ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কারখানার সামনে ও আশপাশে সহস্রাধিক শ্রমিক অবস্থান করছেন। কারখানার ভেতরেও ছিলেন অনেক শ্রমিক। বেলা ১১টার পর শ্রমিকেরা ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকেন। সোয়া ১১টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।
এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, সকালে শ্রমিকেরা কারখানায় আসার সময় কিছুটা অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। পরে শিল্প পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
শিল্প পুলিশ-২ গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিন দফা সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, সেখানে বহিরাগতদের উপস্থিতি ছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে আছে।
এর আগে গত বুধবার রাতের পালায় কাজ করার সময় কালার অ্যান্ড কোং লিমিটেডের সুইং অপারেটর লিজা আক্তার (৩৬) অসুস্থ হয়ে মারা যান। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার হুগলাবানিয়া গ্রামের বাসিন্দা লিজা শ্রীপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। সহকর্মীদের দাবি, গর্ভবতী লিজা অসুস্থতার কারণে ছুটি চাইলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ তা মঞ্জুর করেনি। একই সময়ে আরেক নারী শ্রমিকও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এ ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার শ্রমিকেরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করেন। পরে আশপাশের পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তিনটি পৃথক মামলায় মোট প্রায় ১ হাজার ১০০ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।