যেখানে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের আঁধারঘেরা জীবনে আলোর প্রদীপ জ্বালানোর কথা ছিল, যেখানে স্পর্শের স্পর্শে ফুটে ওঠার কথা ছিল অক্ষরজ্ঞান, সেই স্বপ্নের প্রদীপটিকেই নিভিয়ে দিয়েছে প্রশাসনিক লোভ ও দুর্নীতির বিভীষিকা।
পটুয়াখালী পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে, লতিফ স্কুলের মাঠ সংলগ্ন একটি দোতলা ভবন দীর্ঘ এক দশক ধরে এক নীরব বেদনার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরের দেয়াল দেখলে বোঝার উপায় নেই—এর পেছনে লুকিয়ে আছে সরকারি বরাদ্দের বিপুল অর্থ লোপাট আর চরম জালিয়াতির এক অন্ধকার ইতিহাস।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ১০ বছর আগে সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রলোভন দেখিয়ে জমির মালিকের কাছ থেকে জায়গাটি একপ্রকার জোরপূর্বক কবজা করেন তৎকালীন এক পৌর মেয়র। লক্ষ্য কিন্তু জনসেবা ছিল না, লক্ষ্য ছিল অবকাঠামো নির্মাণের আড়ালে অর্থ আত্মসাৎ। আনুষ্ঠানিক দেড় কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দের সিংহভাগই চলে যায় দুর্নীতিবাজদের পকেটে।
এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ভবনটি কী কাজে ব্যবহৃত হওয়ার কথা—তা যেন এক রহস্যের চাদরে ঢাকা ছিল। দীর্ঘ তিন মাসের ধারাবাহিক অনুসন্ধানের পর অবশেষে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। জানা যায়, এই ঝকঝকে ভবনটি আসলে ‘সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়’। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্য, পুরো ভবনে কোনো সরকারি নামফলক নেই! নেই কোনো বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা।
বিশেষ শিক্ষার আঙিনায় ভাড়াটিয়া, মাস্টারমাইন্ড ‘জোড়া রূপী’ আমিনুল!
যে কক্ষে আলোহীন শিশুদের স্বপ্ন বোনার কথা ছিল, সেই কক্ষে ভাড়াটে লোক বসিয়ে মাস শেষে পকেটে নিয়মিত ভাড়া তুলছিলেন আমিনুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। শুরুতে নিজের পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করলেও অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—এই আমিনুল ইসলাম মূলত উক্ত সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের ‘রিসোর্স শিক্ষক’!
যিনি নিয়মিত সরকারি তহবিল থেকে ভাতা নিচ্ছিলেন, অথচ ভবনে চালাচ্ছিলেন নিজের অবৈধ ভাড়ার ব্যবসা।
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগের পরদিন সকালে দেখা যায় এক অদ্ভুত দৃশ্য। রাতারাতি তিনটি ভাড়াটিয়া পরিবার উধাও হয়ে গেছে ভবন ছেড়ে ! অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, নিজের এই দ্বৈত সাম্রাজ্য সামলাতে তিনি ব্যবহার করতেন দুটি আলাদা সিম। কারণ, তিনি কেবল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের রিসোর্স শিক্ষকই নন, একই সাথে দায়িত্বে আছেন মির্জাগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসারের মূল প্রশাসনিক পদেও!
তথ্য সংগ্রহে পটুয়াখালী জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কাছ থেকে অসহযোগিতার চরম রূপ দেখা গেলেও পরে তারা দাবি করে, আমিনুল ইসলামকে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ হিসেবে রিসোর্স শিক্ষকের কাজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারি বিধিমালা কি তা সমর্থন করে?
প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী, পদে শূন্যতা থাকলে সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। তবে ১০ম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা কীভাবে প্রশাসনিক নিয়ম ভেঙে ৯ম গ্রেডের মূল উপজেলা প্রশাসনিক প্রধান পদে আসীন থাকেন?—এই প্রশ্ন এখন জনমনে। সমাজসেবা কার্যালয়ের অভ্যন্তরীণ এই দোলাচলেই স্পষ্ট যে ক্ষমতার অপব্যবহার ঠিক কত গভীরে পৌঁছেছে।
সামাজিক কল্যাণে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানের এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের অধিবাসী ও দিনমজুর রফিক মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, “যে দপ্তর এতিম ও প্রতিবন্ধীদের বরাদ্দ মেরে পকেট ভারী করে, তাদের তো সমাজসেবা বলা সাজে না! এদের নাম হওয়া উচিত 'এতিম ও প্রতিবন্ধীদের অর্থ আত্মসাৎকারী চোরের খনি'।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রশাসনিক এমন চরম দুর্নীতির বিষবৃক্ষ যদি উপড়ে ফেলা না যায়, তবে সভ্য সমাজব্যবস্থা ধসে পড়বে।
পটুয়াখালীর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকার ফিরিয়ে আনতে এবং এই চক্রকে আইনের আওতায় আনতে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এর কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন নাগরিক সমাজ।