পটুয়াখালীর মানুষের মনে আশার আলো জ্বালানো, সততা ও সাহসিকতার প্রতীক জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি নিয়ে হঠাৎ বদলি হওয়ার ঘটনায় ফুঁসে উঠেছে পুরো পটুয়াখালীবাসী।
মাত্র এক বছরের কার্যকালে যিনি এতিমের হক রক্ষা, দুর্নীতি দমন এবং পটুয়াখালীকে একটি আধুনিক ও সবুজ জেলায় রূপান্তর করার চেষ্টায় ব্রত ছিলেন, তাকে এভাবে সরিয়ে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে নেমে এসেছে ক্ষোভের ছায়া। এ ঘটনার পেছনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক তদবিরের অভিযোগ ওঠায় ফুঁসে উঠেছে ক্ষুব্ধ জনতা; প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণে তীব্র ঘৃণা ও ধিক্কার জানিয়েছেন তারা।
এতিমের মুখে হাসি ফোটানো এই কর্মবীর জেলা প্রশাসক যোগদানের পর থেকেই পটুয়াখালীতে সুশাসন ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। দীর্ঘদিনের এতিমখানার অনিয়ম ও কোটি টাকা লোপাটের চেষ্টা কঠোরহাতে রুখে দিয়ে এতিম শিশুদের মুখে হাসি ফুটিয়েছিলেন তিনি।
পাসপোর্ট অফিস, নির্বাচন অফিসকে দালালমুক্ত করতে সফল উচ্ছেদ অভিযান এবং ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে দালাল ও হয়রানিমুক্ত করে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর মাধ্যমে জনদুর্ভোগ কমিয়েছিলেন। সকল সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা আনায়নের জন্য বাধ্যতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, জবাবদিহিতা কার্যক্রম, মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ।
‘Green Thyself’ ক্যাম্পেইন, অবৈধ ইটভাটা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ডিসি পার্কসহ বিভিন্ন স্থানে শত শত চারা রোপণ করে পটুয়াখালীকে বাস্তবিক সবুজ রূপ দিতে জনসাধারণকে বিপুল উৎসাহের যোগান দেন তিনি।
নদীভাঙন কবলিত মানুষ, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, তৃতীয় লিঙ্গ এবং কারাবন্দীদের পুনর্বাসন ও কল্যাণে নিরলস কাজ করে গেছেন এই প্রশাসক।
যদিও এই কাজগুলোর একটি বড় অংশ দাপ্তরিক রুটিন কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবুও মাঠপর্যায়ে এসবের শতভাগ বাস্তবায়নে তাঁর কঠোর নজরদারি এবং অদম্য সদিচ্ছা ছিল সম্পূর্ণ অবিস্মরণীয়। তাঁর এই আন্তরিক ও কড়া তদারকারির ফলেই পটুয়াখালীর সাধারণ মানুষ প্রতিটি প্রকল্পের সুফল সরাসরি ভোগ করতে শুরু করেছিল।
সম্প্রতি পটুয়াখালী জেলা রাজস্ব প্রশাসনে অফিস সহায়কের (পিয়ন) ১০টি শূন্য পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত প্রার্থী জহিরুল ইসলামের ভাইভায় অসঙ্গতি ধরা পড়ায় এবং হাতের লেখা যাচাইয়ে গরমিল পাওয়া গেলে জালিয়াতি ও প্রক্সি পরীক্ষার বিষয়টি ফাঁস হয়। জহিরুল স্বীকার করেন যে সাখাওয়াত নামের এক ব্যক্তি তার হয়ে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। জালিয়াতির দায়ে ডিসি ড. শহীদ হোসেন চৌধুরী তাৎক্ষণিকভাবে ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করে তাকে পুলিশে সোপর্দ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, এই জালিয়াতি মামলার আসামি জহিরুল ইসলাম ছিলেন প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের পছন্দের প্রার্থী। প্রতিমন্ত্রীর এই অবৈধ তদবির রক্ষা না করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন প্রতিমন্ত্রী। এর পরই ঊর্ধ্বতন মহলে চাপ সৃষ্টি করে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির আড়ালে তাকে পটুয়াখালী থেকে শাস্তিমূলক বদলি করানো হয় বলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে। তবে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, প্রক্সি পরীক্ষার মতো প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া কোনো প্রার্থীর পক্ষে একজন জনপ্রতিনিধির চাকরির সুপারিশ করা সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। যদি সৎ ও আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে কোনো কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়ে থাকে, তবে তা সরকারের নীতি ও সংস্কারের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
একজন সৎ, জিরো টলারেন্স নীতিতে বিশ্বাসী এবং জনবান্ধব প্রশাসককে এভাবে অনৈতিকভাবে সরিয়ে দেওয়ায় পটুয়াখালীর সাধারণ মানুষ স্তম্ভিত। এতিম শিশুদের অভিভাবক ও অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল ডিসি ড. শহীদ হোসেন চৌধুরীর এই আকস্মিক বিদায়ে পটুয়াখালীর মাটি ও মানুষ আজ ব্যথিত।
সেই সঙ্গে, নিজের পছন্দের দুর্নীতিবাজ প্রার্থীকে বাঁচাতে একজন সৎ সরকারি কর্মকর্তার ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার ও রোষানল সৃষ্টির জন্য প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের প্রতি পটুয়াখালীবাসী প্রকাশ করেছে তীব্র ঘৃণা ও ধিক্কার। জনতা অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সৎ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছে ।