যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে অবৈধ কর্মসংস্থান দমনে উল্লেখযোগ্যভাবে অভিযান জোরদার করেছে দেশটির হোম অফিস। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লন্ডনজুড়ে অবৈধ কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে মোট ২,৭১৫টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ২,১৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগের বছর ২০২৪ সালে একই ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়েছিল ২,০০৮টি। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে অভিযানের সংখ্যা বেড়েছে ৭০৭টি, যা প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বৃদ্ধি বর্তমান সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতির বাস্তব প্রতিফলন।
হোম অফিস জানিয়েছে, এসব অভিযান এলোমেলোভাবে পরিচালিত হয় না। গোয়েন্দা তথ্য, জনসাধারণের অভিযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বিত তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মস্থল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিশেষ করে রেস্তোরাঁ, টেকঅ্যাওয়ে, নেল বার, কার ওয়াশ, নির্মাণশিল্প, গুদাম, কৃষিখাত এবং ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবৈধ কর্মসংস্থানের অভিযোগ বেশি থাকায় এসব খাতে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।

হোম অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু অবৈধভাবে কর্মরত ব্যক্তিদের নয়, বৈধ Right to Work যাচাই ছাড়া কর্মী নিয়োগ দেওয়া নিয়োগকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান আইনে প্রতি অবৈধ কর্মীর জন্য সর্বোচ্চ ৬০ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত সিভিল জরিমানা আরোপ করা যেতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা, কারাদণ্ড এবং ব্যবসা পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞার মতো শাস্তির বিধানও রয়েছে।
তবে সরকারের এই কঠোর অবস্থান নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। লন্ডনের কয়েকটি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে লুইশাম কাউন্সিল, মনে করে এ ধরনের অভিযান অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তাদের মতে, অনেক অভিবাসী অপরাধের শিকার হলেও ইমিগ্রেশন জটিলতার আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যেতে দ্বিধা করেন। এতে পুলিশ ও স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে হোম অফিসের দাবি, অবৈধ কর্মসংস্থান শুধু অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের বিষয় নয়; এটি শ্রমিক শোষণ, মানবপাচার, আধুনিক দাসত্ব, কর ফাঁকি এবং সংগঠিত অপরাধের মতো গুরুতর সমস্যার সঙ্গে জড়িত। তাই বৈধ শ্রমবাজার সুরক্ষা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে অবৈধ কর্মসংস্থানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতিতে একটি স্পষ্ট দ্বৈত চিত্র দেখা যাচ্ছে। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকার অবৈধ কর্মসংস্থান দমনে নজিরবিহীন কঠোরতা প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে কিছু স্থানীয় কাউন্সিল অভিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক বজায় রাখতে সীমিত সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ভিন্নমুখী অবস্থান আগামী দিনে লন্ডনের অভিবাসন নীতি, স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা এবং আইন প্রয়োগের কৌশল নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও তীব্র করতে পারে। একই সঙ্গে এটি নিয়োগকর্তাদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—কর্মী নিয়োগের আগে Right to Work যাচাইয়ে কোনো ধরনের অবহেলা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি ও আর্থিক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।