মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে দেশ ছেড়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারত হয়ে পৌঁছেছিলেন পাকিস্তানে। সেখানে জীবিকার সন্ধানে ঘুরতে গিয়ে এক মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় হারান দুই পা। এরপর মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে চলে যান তুরস্কে। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ২৫ বছর।
এই দীর্ঘ সময়ে পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ ছিল না। একসময় স্বজনেরা ধরে নিয়েছিলেন, ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করে অবশেষে দেশে ফিরেছেন তিনি। ২৫ বছর পর ফিরে পেয়েছেন মা, ভাই ও স্বজনদের।
ফরিদের বাড়ি কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং নাছির পাড়ায়। গত ১৮ আগস্ট ভোরে তুরস্ক থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। শৈশবেই দেশ ছাড়ায় নিজের পরিচয়ও ঠিকমতো দিতে পারছিলেন না। শুধু নিজের ও মা-বাবার নাম এবং ‘উখিয়া, কক্সবাজার’ এটুকুই মনে ছিল।

ফরিদকে তাঁর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকার ব্র্যাক মাইগ্রেশন সেন্টারে |ছবি: সংগৃহীত
বিমানবন্দরের এভসেক সদস্যরা তাঁকে প্রবাসীকল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করেন। এরপর স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর পরিবারের সন্ধান পায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।
এরপর ভিডিও কলে ছোট ভাই সৈয়দ আলমের সঙ্গে কথা হয় ফরিদের। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগে ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।
তবে ফরিদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার সবচেয়ে অবাক করা প্রমাণ ছিল তাঁর এক হাতে ছয়টি আঙুল। পাঁচটির বদলে ছয় আঙুল থাকার বিষয়টি মনে রেখেছিল পরিবার। সেই বিশেষ চিহ্ন দেখেই নিশ্চিত হওয়া যায় ফিরে আসা এই মানুষটিই তাঁদের হারিয়ে যাওয়া ফরিদ।
ছোট ভাই সৈয়দ আলম বলেন, ‘আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ ভাই আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাঁকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।’
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানায়, পাকিস্তানে ট্রেনে কাটা পড়ে ফরিদের দুই পা কেটে ফেলতে হয়েছিল। পরে উন্নত জীবন ও চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানব পাচারকারীরা তাঁকে তুরস্কে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করতেন এবং অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছিলেন। সম্প্রতি তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে আটক করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
দেশে ফেরার পর ব্র্যাকের সহায়তায় অবশেষে নিজের পরিবারের কাছে ফিরতে পেরেছেন ফরিদ। কক্সবাজারে থাকা বৃদ্ধ মা নুরজাহান বেগমের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে তাঁকে।
২৫ বছর পর ফিরে আসা ফরিদের গল্প যেন হারিয়ে যাওয়া এক জীবনের নতুন করে শুরু। পরিবার যেখানে তাঁর মৃত্যুর শোক মেনে নিয়েছিল, সেখানেই আজ ফিরে এসেছে স্বজনকে ফিরে পাওয়ার অশ্রুসিক্ত আনন্দ।