আজ সরেজমিনে ঢাকার উত্তরখানের তেরমুখ করাইহাটিতে অবস্থিত আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শন করে এক হৃদয়বিদারক চিত্র দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে মানসিক ভারসাম্যহীন, প্রতিবন্ধী, প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ও অবহেলিত প্রায় ১০০ জন নারী আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি রয়েছে দুধের শিশু থেকে শুরু করে প্রায় পাঁচ বছর বয়সী ৩০–৩৫ জন শিশু।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দা সেলিনা শেলী দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশের মানবিক মানুষের সহযোগিতায় এই আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা করে আসছেন। এখানে প্রায় ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী নারী কোনো বেতন ছাড়াই দিন-রাত অসহায় মা ও শিশুদের সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রটিতে খাদ্য, চিকিৎসা, ওষুধ, পোশাকসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কিছুরই অভাব রয়েছে। সীমিত সামর্থ্য নিয়ে শেলী আপা ও তাঁর সহযোগীরা এই অসহায় মানুষগুলোর পাশে থাকার চেষ্টা করছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা অধিকাংশ মানসিক ভারসাম্যহীন নারী ও শিশুদের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা পরিচয়পত্র নেই। ফলে তারা অসুস্থ হলেও চিকিৎসা পেতে নানা জটিলতার মুখোমুখি হন। প্রশ্ন থেকেই যায়—পরিচয়পত্র না থাকলেই কি একজন মানুষ চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন? তারাও তো বাংলাদেশের নাগরিক এবং একজন মানুষের মতোই বেঁচে থাকার অধিকার রাখেন।
এছাড়া, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা কেউ মৃত্যুবরণ করলে পরিচয়পত্রের জটিলতার কারণে ঢাকার বিভিন্ন কবরস্থানে দাফনের সুযোগ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে মরদেহ ময়মনসিংহের নান্দাইলে নিয়ে গিয়ে দাফন করতে হয়। একজন মানুষের শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের মানবিক দায়িত্ব।
আজ আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রম পরিদর্শনে গিয়ে অসহায় মা, শিশু ও বয়স্ক নারীদের জীবনসংগ্রাম দেখে চোখের পানি ধরে রাখা সত্যিই কঠিন ছিল। তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে পরিবারহীন, পরিচয়হীন ও সমাজের অবহেলার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
মাননীয় সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, দেশের সকল নিবন্ধিত বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া অসহায়, পরিচয়হীন, মানসিক ভারসাম্যহীন, প্রতিবন্ধী ও অবহেলিত মানুষদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিনামূল্যে চিকিৎসা, খাদ্য, ওষুধ, পোশাক এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে, পরিচয়পত্র না থাকলেও মানবিক বিবেচনায় যেন তারা সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পান এবং মৃত্যুর পর ঢাকার যেকোনো সরকারি কবরস্থানে সম্মানের সঙ্গে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের সকল বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, মানবিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং দেশ-বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি আন্তরিক আহ্বান—আপনারা আপনাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আপন নিবাস বৃদ্ধাশ্রমের এই অসহায় মা, শিশু ও বয়স্ক মানুষদের পাশে দাঁড়ান। খাদ্য, ওষুধ, পোশাক, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিংবা আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে তাদের মুখে একটু হাসি ফোটাতে এগিয়ে আসুন। আজ যাদের আমরা সাহায্য করছি, তারা কারও না কারও মা, বোন বা সন্তান। মানবতার সেবাই হোক আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়।