পটুয়াখালী জেলায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মেগা প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কাজে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অর্থ লোপাটের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। জেলা ত্রাণ দপ্তরের কালভার্ট, পোল ও পাঠাগার নির্মাণে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কাজ শেষ না করেই ২ কোটি ৯৪ লাখ টাকার বিল উত্তোলন এবং ৯১ লাখ টাকার ভুতুড়ে বিল এর সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট টিম। যা সারা বাংলাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে । তবে প্রশাসনিক এই হরিলুট ও তদারকি ব্যর্থতার বিষয়ে সরাসরি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক (ডিসি) চৌধুরী আশরাফুল করিম।
বিগত সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন সংক্রান্ত প্রশাসনিক অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কিছু অসাধু কর্মকর্তা উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতে লিপ্ত হন বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে। পরবর্তীতে নতুন কমিশন গঠনের পর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, পটুয়াখালী দুটি পৃথক অভিযান পরিচালনা করে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পায়।
এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে স্থানীয় সাংবাদিকরা জেলা প্রশাসক চৌধুরী আশরাফুল করিমের মুখোমুখি হলে তিনি সরাসরি কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য দিতে রাজি হননি। তিনি সাংবাদিকদের জানান, কোনো তথ্য বা বক্তব্য প্রয়োজন হলে তা লিখিতভাবে তার দপ্তরে জমা দিতে হবে; পরবর্তীতে তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে লিখিত জবাব দেবেন।
আইন ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী যেকোনো নাগরিক বা গণমাধ্যমকর্মী লিখিত আবেদনের মাধ্যমে তথ্য পাওয়ার অধিকার রাখেন। তবে জেলা প্রশাসক হলেন জেলার প্রশাসনিক প্রধান ও সুশাসনের নির্বাহী রূপকার। সারাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মধ্যে তাৎক্ষণিক অনুসন্ধানী প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে "লিখিত প্রশ্ন" চাওয়ার এই কৌশল আইনগতভাবে আংশিক বৈধ হলেও, তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও তাৎক্ষণিক জবাবদিহিতার মৌলিক চেতনাকে ক্ষুণ্ন করে। দূর্নীতি দমন সংক্রান্ত কাজ বাদ দিয়ে অন্য মিটিংয়ে ব্যস্ততাতে প্রাধান্য দেয়া অজুহাত হিসেবে বিবেচনা যোগ্য।
স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সচেতন মহলের মতে, ডিসির এই অনাগ্রহের পেছনে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকার মানসিকতা কাজ করতে পারে। কোটি কোটি টাকার হরিলুট স্থানীয় প্রশাসনের তদারকির চরম ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। সরাসরি কথা বললে প্রশাসনিক দায়ভার কাঁধে আসার ভয়, কিংবা লিখিত উত্তর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠ তীব্রতা কমিয়ে ফেলা এবং তাৎক্ষণিক জবাবদিহিতা এড়ানোই এর মূল উদ্দেশ্য হতে পারে বলে তারা ধারণা করছেন।
অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতি প্রতিরোধে জেলা প্রশাসন কার্যকর তদারকি সংস্থা হলেও পটুয়াখালীতে চলমান মেগা অনিয়মের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো তাৎক্ষণিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। একই সাথে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়নি এবং ঠিকাদারদের কালো তালিকাভুক্ত করার কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
দুদক যখন মাঠে নেমে দুর্নীতির সত্যতা পাচ্ছে, তখন জেলা প্রশাসনের এমন নীরবতা ও গণমাধ্যমকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন নাগরিকরা জানান, প্রশাসনিক প্রধানের এমন আচরণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমন্বিত লড়াইকে দুর্বল করছে এবং তথ্যের মুক্ত প্রবাহে অন্তরায় সৃষ্টি করছে।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ও প্রশাসনিক ছকের বাইরে গিয়ে জেলা প্রশাসন দ্রুত দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমনটাই প্রত্যাশা পটুয়াখালীর সাধারণ মানুষের।