পটুয়াখালী সড়ক বিভাগের অধীনে ২১ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পুনর্নির্মাণ ও শক্তিশালীকরণ কাজে নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখানো হলেও বাস্তবে প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকার হরিলুট বা ‘পুকুরচুরি’ হয়েছে বলে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। এ ঘটনায় পটুয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জামিল আক্তার লিমন ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই দুর্নীতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালী চৌরাস্তা থেকে পায়রাকুঞ্জ ফেরিঘাট এবং নদী পার হয়ে মির্জাগঞ্জের পায়রাকুঞ্জ থেকে সুবিদখালী সেতু পর্যন্ত ৯.৩০৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ১৮ ফিট প্রস্থের এই সড়কটির রক্ষণাবেক্ষণ শেষ হয়েছে । বাজেট কোড ৩২৫৮১১০ এবং ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের এস্টিমেট অনুযায়ী এই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২১ কোটি ১৫ লক্ষ ১৮ হাজার ৩৫ টাকা ৫০ পয়সা। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের শুরুতেই বড় ধরনের শুভঙ্করের ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
পায়রাকুঞ্জ ফেরিঘাটের দুই পাড়ে ব্রিজ নির্মাণ কাজ চলমান থাকার অজুহাত দেখিয়ে প্রাক্কলিত ৯.৩০৩ কিলোমিটারের বিপরীতে বাস্তবে কাজ করা হয়েছে মাত্র ৮.৫ কিলোমিটার। এমনকি অনেক স্থানে সড়কের নির্ধারিত ১৮ ফুট প্রস্থ থেকেও কম কাজ করা হয়েছে। ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, নামমাত্র মালামাল ব্যবহার এবং প্রাক্কলিত উপাংশ সম্পূর্ণ গায়েব করে প্রায় ৭ কোটি ৪১ লক্ষ ৭৫ হাজার ৫৭৪ টাকা ৯৩ পয়সা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
খাতভিত্তিক অনিয়ম ও আত্মসাতের চিত্র অনুযায়ী পাথর ও কার্পেটিংয়ে বড় নয়ছয় হয়েছে Aggregate Base Type-1 খাতে ৬ ইঞ্চি পুরু পাথর ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি। এতে প্রায় ২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা লোপাট হয়েছে। এছাড়া বিটুমিনাস ও কার্পেটিং কাজে দুই ধাপে ৩ ইঞ্চি করার কথা থাকলেও পরিমাণে কম দিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
সাইট ল্যাবরেটরি স্থাপন না করেই ৩ লাখ ৯৬ হাজার টাকা, মাটি ভরাট না করে প্রায় ২৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা এবং ১১০ মিটার আরসিসি প্যালিসাইডিং গাইড ওয়ালের পুরোটাই গায়েব করে ১১ লাখ ৪৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সাইনবোর্ড রক্ষণাবেক্ষণ, জিও-টেক্সটাইল ফিল্টার ফেব্রিকস ব্যবহার, ঢাল সংরক্ষণ এবং প্লাস্টারের কাজ কাগজে-কলমে দেখানো হলেও বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বরাদ্দকৃত সাইন পোস্ট, ট্রাফিক সাইন ও কিলোমিটার পোস্টের একটি বড় অংশ বসানো ছাড়াই পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পথচারীদের অভিযোগ, পটুয়াখালী সড়ক বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে সরকারের কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করা হয়েছে। মানসম্মত কাজ না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই সড়কটি ভেঙে ধসে পড়তে শুরু করেছে ।
এদিকে চাঞ্চল্যকর এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর নজরে এসেছে। দুদক সমন্বিত কার্যালয় পটুয়াখালী থেকে জানানো হয়েছে, এসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগটি প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। দুদকের এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের শিডিউল অনুযায়ী এ বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালীর নবনিযুক্ত জেলা প্রশাসক চৌধুরী আশরাফুল করিম এর বক্তব্য চাওয়া হয়েছে।