১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

লন্ডনে আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকের ‘গ্র্যান্ড মিলাদুন্নবী মাহফিল’ অনুষ্ঠিত

লন্ডনে আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকের ‘গ্র্যান্ড মিলাদুন্নবী মাহফিল’ অনুষ্ঠিত

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্ম, অনুপম চরিত্র, মানবতার প্রতি ভালোবাসা ও উম্মতের প্রতি তাঁর অসীম মমত্ববোধ স্মরণে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘দ্য গ্র্যান্ড মিলাদুন্নবী মাহফিল ২০২৬’। আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকের উদ্যোগে আয়োজিত এ মাহফিলে বিপুলসংখ্যক আলেম-উলামা, ইমাম-খতিব, শিক্ষক, কমিউনিটি নেতা, সামাজিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশগ্রহণ করেন।

গত রোববার (৩০ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় লন্ডনের দ্য অ্যাট্রিয়ামে অনুষ্ঠিত মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সভাপতি ছাহেবজাদা হযরত আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকের সভাপতি হযরত মাওলানা নজরুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হযরত মাওলানা মুহাম্মদ হাসান চৌধুরী। উপস্থাপনায় ছিলেন জয়েন্ট সেক্রেটারি মাওলানা ফরিদ আহমদ চৌধুরী এবং প্রেস অ্যান্ড পাবলিসিটি সেক্রেটারি মাওলানা খায়রুল হুদা খান। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন গ্রেটার লন্ডন ডিভিশনের সভাপতি হাফিজ মাওলানা কয়েছ উজ জামান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হযরত আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর মহান চরিত্র এবং সীরাত অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা কোনো আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; বরং এটি একজন মুমিনের অন্তরের গভীরতম অনুভূতি এবং ঈমানের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রকাশ।

তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন মানবজাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তাঁর কথা, কাজ, আচার-আচরণ, পারিবারিক ও সামাজিক জীবন, প্রতিবেশীর অধিকার, দরিদ্র ও অসহায়ের প্রতি মমতা এবং ন্যায়বিচারের শিক্ষা মানুষের জন্য অনুসরণীয়।

আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী বলেন, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ক্ষমাশীলতা, বিনয়, ধৈর্য, দয়া ও ন্যায়পরায়ণতায় রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম আদর্শ। যারা তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের প্রতিও তিনি ক্ষমা ও উদারতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এতিম, মিসকিন, দুর্বল, প্রতিবেশী ও সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ মানবতার ইতিহাসে অনন্য।

তিনি আরও বলেন, মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিলের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আগমন স্মরণ করা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা, তাঁর সীরাত আলোচনা করা এবং সুন্নাহ অনুসরণের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। শুধু মাহফিলে অংশগ্রহণ বা প্রশংসা করাই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত রাসুলপ্রেম হলো তাঁর আদর্শকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করা।

বর্তমান সময়ে মুসলিম সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি উল্লেখ করে তিনি বলেন, উম্মাহর ঐক্য, পারস্পরিক ভালোবাসা ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সীরাতকে জীবনের পথনির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত করা এবং তাদের অন্তরে রাসুলপ্রেম জাগিয়ে তোলা অভিভাবক, আলেম ও সমাজের দায়িত্ব।

মাহফিলে বক্তব্য দেন আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সাবেক সভাপতি হযরত আল্লামা আবদুল জলিল, লতিফিয়া উলামা সোসাইটির সভাপতি মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা শেহাব উদ্দিন, লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটি ইউকের সেক্রেটারি মুফতি আশরাফুর রহমানসহ বিশিষ্ট আলেম-উলামা। বক্তারা মহানবী (সা.)-এর জীবন ও চরিত্র অনুসরণ, সুন্নাহর শিক্ষা এবং মুসলিম সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আঞ্জুমানে আল ইসলাহর সাবেক সভাপতি হযরত আল্লামা আবদুল জলিল বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন মানবতার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান রহমত। তাঁর সীরাত শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জীবন পরিচালনার পথনির্দেশ।

মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা শেহাব উদ্দিন বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন যত বেশি অধ্যয়ন করা হবে, তাঁর প্রতি ভালোবাসা তত গভীর হবে। মিলাদুন্নবী মাহফিলের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সীরাত ও সুন্নাহর শিক্ষা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং নবীজির আদর্শে জীবন গঠনের প্রেরণা সৃষ্টি করা।

মুফতি আশরাফুর রহমান নবীজির ইরহাসাত তুলে ধরে বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ তাঁর সুন্নাহকে ভালোবাসা ও অনুসরণ করা। তিনি তরুণ প্রজন্মকে মহানবী (সা.)-এর জীবনচরিত অধ্যয়নের আহ্বান জানান।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিন্সিপাল মাওলানা সালমান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী, জয়েন্ট সেক্রেটারি মাওলানা এম. এ. কাদির আল হাসান, দারুল হাদীস লতিফিয়াহর ভাইস প্রিন্সিপাল মাওলানা মো. আবদুল কাহহার, বায়তুল আমান মসজিদের খতিব মাওলানা আবদুল মালিক, লন্ডন ডিভিশনের সহসভাপতি মাওলানা আবদুল জলিলসহ আরও অনেকে।

মাহফিলে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বহু আলেম, ইমাম-খতিব ও কমিউনিটি নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটির সভাপতি মুফতি মাওলানা ইলিয়াস হুসাইন, আল ইসলাহর সহসভাপতি মাওলানা সাদ উদ্দিন সিদ্দিকী, উপদেষ্টা ইমদাদ হুসাইন, মাওলানা হাবিবুর রহমান, ওয়েলশ ডিভিশনের সভাপতি হাফিজ মাওলানা ফারুক আহমদ, সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য কাউন্সিলর দিলওয়ার আলী, মাওলানা আবদুল আউয়াল হেলাল, মাওলানা মো. আবদুল কুদ্দুছ, বদরুল ইসলাম, সেন্ট্রাল কাউন্সিলের কোষাধ্যক্ষ হাজী আবদুস সালাম, সদরুল ইসলাম, মাওলানা মো. মুসলেহ উদ্দিন, দেওয়ান মনজুর আহমদ চৌধুরী, হাজী আবুল কাসেম, হাজি সিরাজ খান ও মিজান খানসহ আরও অনেকে।

অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন থেকে হৃদয়গ্রাহী তিলাওয়াত করেন কারী হুসাইন আহমদ। পরে মহানবী (সা.)-এর শানে নাশিদ পরিবেশন করেন মাওলানা সুলতান আহমদ, মামুন রশিদ, আহমদ নিয়াজ ও কবির হুসাইন। তাঁদের পরিবেশনায় মাহফিলস্থলে সৃষ্টি হয় এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে দারুল হাদীস লতিফিয়াহর প্রধান শিক্ষক হাফিজ মাওলানা আনহার আহমদ পবিত্র মিলাদ শরিফ পাঠ করেন। এ সময় উপস্থিত মুসল্লিরা দরুদ ও সালাম পাঠে অংশ নেন এবং মহানবী (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন।

পরে মুসলিম উম্মাহর শান্তি, নিরাপত্তা, ঐক্য ও কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নিপীড়িত, অসহায় ও বিপদগ্রস্ত মুসলমানদের জন্যও বিশেষভাবে দোয়া করা হয়। একই সঙ্গে সমগ্র মানবজাতির শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণ কামনা করা হয়।

বক্তারা বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমনের স্মরণকে অর্থবহ করতে হলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা অন্তরে ধারণ করার পাশাপাশি তাঁর সীরাত অধ্যয়ন এবং সুন্নাহ ও মহান চরিত্রকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতে হবে।

মাহফিলের আয়োজক আঞ্জুমানে আল ইসলাহ ইউকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান অতিথি, আলেম-উলামা, ইমাম-খতিব, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ, অতিথি ও সর্বস্তরের মুসল্লিদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের আয়োজন যুক্তরাজ্যে বসবাসরত মুসলিম সমাজ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা, সীরাতচর্চা, সুন্নাহর অনুসরণ ও ইসলামী মূল্যবোধকে আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।