দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক প্রণোদনা এবং দ্বৈত মুদ্রা (ডুয়াল কারেন্সি) কার্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করতে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ‘প্রবাসী কার্ড’। প্রাথমিকভাবে এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চিকিৎসাসেবা ও সরকারি সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্তত ১০টি বিশেষ সুবিধা ও অগ্রাধিকার পাবেন।
গতকাল শনিবার (১৮ জুলাই ২০২৬) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চামেলী হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে জানানো হয়, প্রবাসীদের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও দ্বৈত মুদ্রা কার্ডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে মূল্য পরিশোধসহ আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ক্রীড়া কার্ডের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রবাসীদের কল্যাণে এই বিশেষ কার্ড চালুর কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
প্রবাসী কার্ডের আওতায় প্রবাসীদের জন্য মোট ১০টি বিশেষ সুবিধা ও অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশে ও বিদেশে সৌজন্যমূলক বিমানবন্দর লাউঞ্জ (বিশ্রামাগার) ব্যবহারের সুযোগ এবং বিশেষ অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) বুথের মাধ্যমে দ্রুত সেবা। এছাড়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর প্রবাসীরা সৌজন্যমূলক অভ্যর্থনা ও সহায়তা (মিট অ্যান্ড গ্রিট) সেবা পাবেন। বিমান টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে মিলবে বিশেষ ছাড়। দেশে ও বিদেশে ন্যায্যমূল্যে গাড়ি বুকিংয়ের সুবিধার পাশাপাশি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন (সিগনেচার) কার্ডধারীদের জন্য থাকবে বিমানবন্দর থেকে বিশেষ আনা-নেওয়ার (পিক অ্যান্ড ড্রপ) সেবা।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সেবা বুথ স্থাপন করা হবে এবং দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবায় বিশেষ ছাড় পাবেন কার্ডধারীরা। কোনো প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে ও বিনা মূল্যে মরদেহ দেশে আনার সুবিধা নিশ্চিত করা হবে এই কার্ডের মাধ্যমে। প্রবাসফেরত নাগরিকদের জন্য থাকবে বিশেষ পুনর্বাসন সহায়তা এবং বীমা সুবিধা। এছাড়া জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি (মিউটেশন), ইউটিলিটি সংযোগ, নতুন লাইসেন্স গ্রহণ এবং বাংলাদেশে যেকোনো বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রবাসীরা বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন। রেমিট্যান্স পাঠানোর বিপরীতে পুরস্কার পয়েন্ট (রিওয়ার্ড পয়েন্ট), ঋণযোগ্যতার মানদণ্ড (ক্রেডিট স্কোরিং) সুবিধা, সহজ শর্তে ঋণ এবং কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি ও নিরাপদে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ থাকছে। একই সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র, নতুন পাসপোর্ট তৈরি বা নবায়ন, কনস্যুলার সেবা এবং ব্যাংকিং সংক্রান্ত সব নাগরিক কাজে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবেন।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুই ধাপে এই কার্ড বিতরণ ও ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পন্ন হবে। আগামী আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে এর পরীক্ষামূলক উদ্বোধন হবে। প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ‘প্রবাসী ডেবিট কার্ড’ ইস্যু করা হবে। আগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে ৫০ হাজার এবং ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে ২ লাখ প্রবাসীকে এই কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী কার্ড-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম ও সেবা স্থায়ীভাবে পরিচালিত হবে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত সব বাংলাদেশি প্রবাসী যেন দ্রুত এই কার্ডের আওতায় আসতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে দেশের যুবসমাজকে বৈশ্বিক বাজারের উপযোগী করে গড়ে তুলতে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করার তাগিদ দেন তিনি।
উক্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ও মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।