ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মারা যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ (২৮)-এর বিরুদ্ধে মৃত্যুর দিনই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করা হয়। তবে ডিবির দায়ের করা মামলার এজাহারে ঘটনাবিবরণ, সময়, স্থান এবং গাঁজা উদ্ধারের বর্ণনায় একাধিক অসংগতি উঠে এসেছে।
গত ২১ জুন ফরিদপুর ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আহাদুজ্জামান মধুখালী থানায় মামলাটি দায়ের করেন। একই দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইশতিয়াকের মৃত্যু হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০ জুন দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ অভিযান চালায়। সেখানে ইশতিয়াক পালানোর চেষ্টা করলে তাকে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি নিজের প্যান্টের ডান পকেট থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা বের করে পুলিশের হাতে তুলে দেন বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ইশতিয়াককে দিনের বেলায়, বিকেল পাঁচটার দিকে, মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্দারদিয়া এলাকায় তাঁর বাড়ির সামনে থেকে আটক করা হয়। ভিডিওতে তাঁর পরনে লুঙ্গি ও জামা দেখা যায়, প্যান্ট নয়।
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাঁকে চড়-থাপ্পড় মারছেন এবং দেহ তল্লাশি করছেন। পরে ইশতিয়াকের কাছ থেকে কিছুটা দূরে পড়ে থাকা একটি বস্তু দেখিয়ে একজনকে বলতে শোনা যায়, “এই যে এক পোঁটলা।”
মামলার দুই সাক্ষীর বক্তব্যও এজাহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এক সাক্ষী মো. আলমগীর হোসেন জানান, তিনি মামলায় উল্লেখিত ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তাঁর দাবি, ২০ জুন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মরিচ বাজারে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশ তাঁর পরিচয় ও ঠিকানা সংগ্রহ করে। পরে জানতে পারেন, তাঁকে মাদক মামলার সাক্ষী করা হয়েছে।
অন্য সাক্ষী বিনয় কুমার সাহা-র ছেলে বাঁধন সাহা বলেন, ঘটনার সময় তাঁর বাবা বাজারের ভেতরে দোকানে ছিলেন, যা ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ সাক্ষী হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করে এবং জোরপূর্বক তাঁর বাবার স্বাক্ষর নেয়।
ঘটনার সময় ইশতিয়াকের পরনে লুঙ্গি ছিল—এটি ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা গেলেও, মামলার এজাহারে বলা হয়েছে তিনি নিজের প্যান্টের ডান পকেট থেকে গাঁজা বের করে দেন। এই বর্ণনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া এজাহারে বলা হয়েছে, উদ্ধার করা কথিত গাঁজা থেকে পাঁচ গ্রাম রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করে বাকি অংশ আলামত হিসেবে জমা দেওয়া হয়েছে। যদিও পরীক্ষার আগে বস্তুটি প্রকৃতপক্ষে গাঁজা কি না, তা নিশ্চিত না হয়েই মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, ডিবি পুলিশ যে এজাহার প্রস্তুত করে দিয়েছে, সেটিই থানা মামলা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন,
“এজাহারের ভাষার ওপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ডিবি যেভাবে লিখেছে, সেভাবেই মামলা রেকর্ড হয়েছে। পরে একমাত্র আসামির মৃত্যু হওয়ায় মামলার অভিযোগপত্র আর দেওয়া হয়নি।”
মাদক আইনে মামলা প্রসঙ্গে ওসি আরও বলেন, উদ্ধার হওয়া বস্তু প্রথমে গাঁজাসদৃশ হিসেবে বিবেচনা করেই মামলা করা হয়। পরে রাসায়নিক পরীক্ষায় যদি সেটি মাদক না প্রমাণিত হয়, তাহলে সে অনুযায়ী মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হয়।
ঘটনাটি ঘিরে ডিবি পুলিশের ভূমিকা, এজাহারের তথ্যগত অসংগতি এবং সাক্ষীদের বক্তব্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।