২৮ জুন, ২০২৬

২৪ ঘণ্টায় ২২ ঘণ্টা লোডশেডিং, অন্ধকারে আলফাডাঙ্গা; বিপর্যস্ত জনজীবন

২৪ ঘণ্টায় ২২ ঘণ্টা লোডশেডিং, অন্ধকারে আলফাডাঙ্গা; বিপর্যস্ত জনজীবন

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ২২ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। দিন-রাত মিলিয়ে ২০ থেকে ৩০ বার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। প্রতিবার বিদ্যুৎ এলেও তা মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিট স্থায়ী হচ্ছে। এতে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার কয়েক লাখ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ সংকট চলছে। মাঝখানে কয়েকদিন বৃষ্টিপাত হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও গত প্রায় এক মাস ধরে আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং।

ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আলফাডাঙ্গা জোনাল অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আলফাডাঙ্গা সাব-স্টেশনে বিদ্যুতের চাহিদা ৫ দশমিক ৬৫ মেগাওয়াট, অথচ জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৩ দশমিক ৩২ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ২ দশমিক ৩৩ মেগাওয়াট, অর্থাৎ ৪১ শতাংশ ঘাটতি নিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত চাহিদা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।

আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বয়স্করা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। ব্যাটারিচালিত যানবাহন চার্জ দিতে না পারায় চালকদের আয়-রোজগার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সেচযন্ত্র চালাতে না পেরে কৃষকেরা ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।

বানা ইউনিয়নের রুদ্র বানা গ্রামের এইচএসসি পরীক্ষার্থী নাঈম মোল্যা বলেন, "বিদ্যুৎ আসে ১০ মিনিটের জন্য, তারপর আবার চলে যায়। রাত-দিন মিলিয়ে দুই ঘণ্টাও থাকে না। এই গরমে আলো ছাড়া কীভাবে পড়াশোনা করব? অনলাইনে কোনো কাজও করা যাচ্ছে না।"

বুড়াইচ ইউনিয়নের ভ্যানচালক নান্নু শেখ বলেন, "কারেন্ট না থাকায় ভ্যান চার্জ দিতে পারি না। আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। আগে এমন অবস্থা ছিল না। নতুন সরকার দ্রুত একটা ব্যবস্থা নিক।"

পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও সার-কীটনাশক ব্যবসায়ী আসিফ ইকবাল হাসমত বলেন, "ঢাকায় এক মিনিটের জন্যও বিদ্যুৎ যায় না, অথচ এখানে বিদ্যুৎই থাকে না। এলে ১০ মিনিট পর আবার চলে যায়। অন্তত নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকলে মানুষ প্রস্তুতি নিতে পারত। সরকার বলছে বিদ্যুতের ঘাটতি নেই, তাহলে আলফাডাঙ্গার মানুষ কেন এমন ভোগান্তিতে?"

লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও। রোগী ও তাদের স্বজনদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে ওয়ার্ডে অবস্থান করাই কষ্টকর হয়ে উঠেছে। শ্বাসকষ্টের রোগীদের নেবুলাইজার ও অক্সিজেন সেবা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক সময় ইসিজি, এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না।

অন্যদিকে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে সংরক্ষণযোগ্য ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ওষুধ ব্যবসায়ীরা। উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় ঘরে সংরক্ষিত মাছ-মাংস নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন দোকানে আইসক্রিমসহ হিমায়িত খাদ্যপণ্য নষ্ট হওয়ায় ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

এদিকে চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো চলাকালেও আলফাডাঙ্গাজুড়ে একইভাবে লোডশেডিং অব্যাহত থাকায় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়রা জানান, রাতভর খেলা দেখার জন্য হাজারো দর্শক টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে তারা ম্যাচ উপভোগ করতে পারছেন না। এতে বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ বাড়ছে। কয়েকজন বাসিন্দা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

এ বিষয়ে ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সহকারী  জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) আশিষ কুমার  রায় বলেন, "আমি এখানে যোগদানের পর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে নড়াইল থেকে আমাদের শুকুরহাটা সাব-স্টেশনে ৩৩ কেভি লাইন সংযোগের অফিসিয়াল অনুমোদন এনেছি। ইতোমধ্যে টেন্ডারও সম্পন্ন হয়েছে। ঠিকাদার যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করতে পারে, সে বিষয়ে আমরা তাগিদ দেব। এটি বাস্তবায়িত হলে আলফাডাঙ্গাসহ আশপাশের এলাকার বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমে আসবে। তবে বর্তমান বিদ্যুৎ বরাদ্দ চাহিদার তুলনায় এখনও অপর্যাপ্ত। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন।"

ফরিদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার এস এম নাসির উদ্দিন বলেন, "জাতীয় গ্রিড থেকেই চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। আলফাডাঙ্গায় দিনে ৭ থেকে ৮ মেগাওয়াট এবং রাতে ৭ থেকে ১০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মাত্র ৩ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বৃষ্টিপাত হলে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমবে, ফলে লোডশেডিংও কমতে পারে। এছাড়া আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে আমরা আশাবাদী।"

টানা লোডশেডিংয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। দ্রুত স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে জনদুর্ভোগ লাঘবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।