এক সময় দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম সুনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল মাদারীপুরের কালকিনির ঐতিহ্যবাহী সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষক অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্বলতা, অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা ব্যবস্থা চরমভাবে ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একদিকে শিক্ষার মান নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছে, অন্যদিকে কলেজ ভবনের বেহাল অবস্থাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে।
অভিযোগ রয়েছে, কলেজে একাধিক অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনেক শিক্ষক নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন না। কলেজ চলাকালীন সময়ে শিক্ষকদের ক্যাম্পাসের বাইরে আড্ডা দিতে দেখা যায়। আবার কেউ কেউ হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বাসায় চলে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কলেজ সূত্র ও সরেজমিনে জানা যায়, ৬২ জন শিক্ষক নিয়ে কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও অনার্স শাখার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ১২টি বিভাগের মধ্যে অধিকাংশ বিভাগেই শিক্ষার্থী সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরে কয়েকটি বিভাগে মাত্র ১ থেকে ৪ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া কলেজ চলাকালীন সময়েও সকাল সাড়ে ১১টায় কয়েকটি বিভাগের কক্ষ তালাবদ্ধ দেখা গেছে। এ সময় কিছু শিক্ষককে কলেজের বাইরে আড্ডা দিতে দেখা যায় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছিল। পরবর্তীতে এটি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উন্নীত হয় এবং অনার্সে ১২টি ও মাস্টার্সে ৩টি বিভাগ চালু করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করতেন।
তবে সাবেক অধ্যক্ষ মো. খালেকুজ্জামানের অবসরের পর স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ছয়জন অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দায়িত্ব পালন করায় প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এতে শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং ও সমন্বয়হীনতা বাড়তে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুন নাহারের বিরুদ্ধে গত চার বছর ধরে বিভাগীয় কার্যক্রম ও ক্লাসে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ তুলেছেন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক এস এম জলিল।
যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে নাজমুন নাহার বলেন, তিনি নিয়মিত কলেজে যান এবং হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেন। তার দাবি, বিভাগে শিক্ষার্থী কম থাকায় নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার সুযোগ হয় না।
কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন একাডেমি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষা অনুরাগী আবুল কালাম আজাদ বলেন, “সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন কলেজটিকে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তর করেন। এক সময় এটি দক্ষিণবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত ছিল। দেশের বিভিন্ন বিভাগ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করতে আসত। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, শিক্ষকদের মতপার্থক্য ও গ্রুপিংয়ের কারণে আজ কলেজটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। কলেজের হারানো সুনাম ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভবন নির্মাণ, কলেজটি সরকারি করা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আন্তরিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।”
কলেজের বিদ্যোৎসাহী সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফজলুল হক বেপারী বলেন, “কলেজের শিক্ষার মান বর্তমানে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এর জন্য শিক্ষক রাজনীতি ও দলাদলি দায়ী। কলেজের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলকে এগিয়ে আসতে হবে।”
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হান্নান দরিয়া বলেন, “আমি চার মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছি। এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এত বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষার্থী ভর্তি বাড়াতে প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে তারা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেক সময় প্রতিবাদ করতে গেলে হুমকির মুখে পড়তে হয়।”
অভিযুক্ত শিক্ষিকা নাজমুন নাহারের বিষয়ে তিনি বলেন, “তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভাগে নিয়মিত যান না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করে গভর্নিং বডির সভায় উপস্থাপন করা হবে।”
কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফ-উল আরেফীন বলেন, “শিক্ষকদের অনিয়মিত পাঠদান, দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে কলেজ পরিচালনা এবং শিক্ষকদের অন্তর্দ্বন্দ্বের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।”
সচেতন মহলের মতে, কলেজে পূর্ণাঙ্গ প্রশাসন গঠন, শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলেই কালকিনি সৈয়দ আবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব।